নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা, গাদি আইজেনকটকে সমর্থন দিতে যাচ্ছে আরব দলগুলো

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক দরকষাকষি। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির আরবভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। এতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PoriPurno.com
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার গঠন নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ।
এ পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছে দেশটির আরবভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। এর ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখার একটি নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি হতে পারে।
২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে আল-জাজিরার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের আরব দলগুলো আইজেনকটের বিরোধী জোটকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে এগিয়ে এসেছে। তবে এই সমর্থন মানেই যে তারা সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দিচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়।
নির্বাচনে কোন দল কতটি আসন পেয়েছে?
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ৬১টি আসন প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী:
- নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন।
- গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
- আরবভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন।
আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন এবং রা’আম পেয়েছে ৮টি আসন।
ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের সমর্থন পেলে আইজেনকটের জোটের পক্ষে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা সহজ হতে পারে।
গাদি আইজেনকট কে?
গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের একজন সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমান বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি এবারের নির্বাচনে ২১টি আসন পেয়েছে। নেতানিয়াহুবিরোধী অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে তাঁর জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮।
বর্তমানে সরকার গঠনের দৌড়ে তাঁকে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরব দলগুলোর সমর্থন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সরকার গঠনে অংশগ্রহণ একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশটির মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ আরব নাগরিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আসছে।
এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং আরব দলগুলোর ১৯টি আসন অর্জন তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রা’আম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাস আইজেনকটের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতারাও নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে সব আরব দল একইভাবে সরকারে যোগ দিতে আগ্রহী নয়। কেউ সরাসরি জোটে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সংসদে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে।
আইজেনকটের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?
আরব দলগুলোর সমর্থন পেলেও আইজেনকটের জন্য সরকার গঠন সহজ হবে না। কারণ তাঁর বিরোধী জোটের ভেতরেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।
এ ছাড়া আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট বা সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা রয়েছে।
আইজেনকট ও তাঁর সহযোগীরা অতীতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে কিছু শর্তের কথা জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, সামরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অবস্থান এবং হামাসের নিন্দা জানানোর মতো বিষয় রয়েছে।
অন্যদিকে আরব দলগুলোরও নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি রয়েছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
১০ নভেম্বর কী ঘটবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, আগামী ১০ নভেম্বর গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।
তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আল-জাজিরার ১ নভেম্বর প্রকাশিত ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের তারিখ নয়।
নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যাঁকে সরকার গঠনের জন্য মনোনীত করা হবে, তিনি প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
একদিকে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে আইজেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিরোধী পক্ষের ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ ছাড়া কোনো পক্ষ সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের ক্ষমতার রাজনীতিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হচ্ছে। আরব দলগুলোর সমর্থন, বিরোধী জোটের ঐক্য এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে দেশটির পরবর্তী সরকার কার নেতৃত্বে গঠিত হবে।
সর্বশেষ তথ্য: ৩ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত গাদি আইজেনকটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। সরকার গঠনের আলোচনা চলমান রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র
Al Jazeera – Arab parties back Eisenkot: What’s the latest in Israel’s coalition talks?
Al Jazeera – Israel election: When will government be formed, who will lead it?
Associated Press – Israeli officials say elections will stand
Ynet – Netanyahu does not rule out PM rotation with Eisenkot

